ভূমিকা:

আমরা কোরান মুখস্ত করি, কিন্তু বুঝি না কেন?

বর্তমান মুসলিম সমাজে কোরান নিয়ে একটি গভীর আত্মবিচ্ছিন্নতা তৈরি হয়েছে। আমরা কোরানকে সবচেয়ে পবিত্র গ্রন্থ মনে করি, কিন্তু তার নির্দেশনায় জীবন গঠন করি না। কোরান আরবীতে মুখস্ত করি, অথচ অনুসরণ করি হাদিস বা অন্য উৎসের নিয়মকানুন

আল্লাহ বলছেন:

“এই কোরানই পথপ্রদর্শক, যা মেনে চলতে হবে।”
সুরা জাসিয়া ৪৫:১১

 


কিন্তু আমরা সেই কোরানের বদলে হাদিস, মাসালার বই, বিভিন্ন ফতোয়া, ইজমা, কিয়াস ইত্যাদিকে অনুসরণের মূল ভিত্তি বানিয়ে নিয়েছি। অথচ কোরানই একমাত্র দলিল, যা আল্লাহ নিজে অবতীর্ণ করেছেন। আজকের এই লেখায় আমি সেই কোরানকেই বুঝে পড়ার গুরুত্ব ও আহ্বান তুলে ধরবো, সাথে থাকছে বহু কোরানের বাক্য, যে বাক্যগুলোকে হয়তো আমরা বহুদিন অবহেলা করে এসেছি।

১. কোরানই সর্বশ্রেষ্ঠ পথনির্দেশ: আল্লাহর ঘোষণা।

আল্লাহ নিজেই বলেছেন — এই কোরানই যথেষ্ট:

“আমি এই কোরানে মানুষের জন্য সব রকম দৃষ্টান্ত বর্ণনা করেছি, যেন তারা চিন্তা করে।”
সুরা যুমার ২৭

“ নিঃশ্চয়ই আমি এই কোরানে মানুষের জন্য সর্বপ্রকার উপমা বর্ণনা করেছি।”
সুরা কাহফ ৫৪

এই দুইটি আয়াত অত্যান্ত স্পষ্টভাবে জানান দেয়, কোনো বিষয় বুঝতে হলে কোরানই যথেষ্ট। অথচ আজ আমরা অন্য উৎস খুঁজি, হাদিস খুঁজি, মাযহাব খুঁজি, ইমামদের মত খুঁজি।
আল্লাহ আরও বলেন:

“এই কিতাব আমি তোমার প্রতি এ জন্যই নাযিল করেছি, যেনো মানুষকে অন্ধকার থেকে আলোতে নিয়ে আসতে পারো।”
সুরা ইব্রাহিম ১

এটি আল্লাহর পক্ষ থেকে সরাসরি একটি দায়িত্ব, এবং সেই দায়িত্ব কেবল কোরানের মাধ্যমে পালন করা সম্ভব।

২. “কোরান কি আমরা বুঝবো?” — আল্লাহ নিজেই বলেছেন বুঝার জন্যই কোরান।

বহু মুসলিম বলে থাকেন, “আমরা তো সাধারণ মানুষ, কোরান বুঝবো কীভাবে?” অথচ কোরান নিজেই এর উত্তর দিয়েছে:

“আমি কোরান আরবি ভাষায় নাযিল করেছি, যেনো তোমরা বুঝতে পারো।”
সুরা ইউসুফ ২

 

“একটি কিতাব, যার বাক্যগুলি সুস্পষ্ট করা হয়েছে, আরবী কোরান, জ্ঞানী সম্প্রদায়ের জন্য।”
সুরা হা-মীম সাজদা ৩

তাহলে বুঝা যাচ্ছে, কোরান একটি স্পষ্ট কিতাব। এর ভাষা, রীতি, উদাহরণ সব কিছু মানুষের জন্য সহজ করা হয়েছে।

“আর নিশ্চয়ই আমি কোরানকে উপদেশ গ্রহণের জন্য সহজ করে দিয়েছি। অতএব, উপদেশ গ্রহণকারী কেউ আছে কি?”
সুরা আল-কামার ১৭, ২২, ৩২, ৪০ (চারবার)

এটি বারবার বলা হয়েছে যেন আমাদের মনে কোনো সন্দেহ না থাকে। কোরান বুঝা অসম্ভব নয়।

৩. কিভাবে পড়লে কোরান বুঝবো?

এবার দেখা যাক, কোরান নিজেই কি আমাদের কোনো পদ্ধতি বলেছে কীভাবে কোরান পড়লে তা বুঝবো?

“তুমি কোরান ধীরে ধীরে, স্পষ্টভাবে পাঠ করো।”
সুরা মুজাম্মিল ৪

এখানে "তরতীল" শব্দটি এসেছে, যার মানে হচ্ছে ধীরে, গভীরভাবে, পর্যায়ক্রমে পড়া। শুধু টানা মুখস্ত পড়া নয়, বরং বাক্যের শব্দ ধরে ধরে অনুধাবন করা।

আর মুজাম্মিল ২০ নং বাক্যে বলা হয়েছে:

“তোমাদের যে কেউ কোরান পড়ে, এবং সালাত কায়েম করে… তারা যেনো বুঝে নেয় এবং শিক্ষা গ্রহণ করে।”

এই আয়াত সরাসরি বুঝিয়ে দিচ্ছে, কোরান পাঠের উদ্দেশ্য হচ্ছে শিক্ষা গ্রহণ ও অনুধাবন।

৪. কোরান মুখস্ত করা, কোরান অনুসরণ করা।

আজকের সমাজে “হাফেজে কোরান” বলে গর্ব করা হয়। কিন্তু তারা কি কোরান বুঝে পড়েছে? নাকি কেবল মুখস্ত করেছে?

আল্লাহ বলছেন:

“তারা কি কোরান নিয়ে চিন্তা-ভাবনা করে না? নাকি তাদের অন্তর তালাবদ্ধ?”
সুরা মুহাম্মদ ২৪

“তারা কি কোরান অনুধাবন করে না? যদি এটা আল্লাহ ছাড়া অন্য কারো কাছ থেকে হতো, তাহলে এতে বহু বিভ্রান্তি থাকতো।”
সুরা নিসা ৮২

শুধু মুখস্ত করাই যথেষ্ট নয়। কোরান বারবার বলছে, চিন্তা করো, গবেষণা করো, উপলব্ধি করো।

৫. হেদায়াত পাবে কারা? যারা শুনে, বুঝে, গ্রহণ করে।

আল্লাহ বলছেন:

“যারা কথা শোনে এবং এর মধ্যে থেকে উত্তমটিকে গ্রহণ করে, এরাই তারা, যারা আল্লাহর কাছ থেকে হেদায়াত পেয়েছেন এবং তারাই বুদ্ধিমান।”
সুরা যুমার ১৮

এই আয়াতটি আমাদের চিন্তার কেন্দ্রবিন্দু হওয়া উচিত। কোরান বুঝে, যাচাই করে, বাছাই করে গ্রহণ করতে হবে। অন্ধভাবে নয়।

“আর কোরান তো এক উপদেশ — সুতরাং যার ইচ্ছা সে তা মেনে চলবে।”
সুরা আবাসা ১১–১২

৬. কিয়ামতের দিনে প্রত্যেককে তার কিতাব নিজেই পড়তে হবে।

আজ আমরা কোরান না বুঝে মুখস্ত করে যাচ্ছি। কিন্তু আল্লাহ বলছেন:

“তোমার কিতাব পড়ো; আজ তোমার হিসাবের জন্য তুমি নিজেই যথেষ্ট।”
সুরা বনি ইসরাইল ১৪

এই আয়াতটি অত্যন্ত গভীর অর্থ বহন করে। সেখানে কাউকে বলে দেওয়া হবে না—“তোমার জন্য ইমাম, হাদিস, মাযহাব ছিল”, বরং বলা হবে “তুমি নিজেই তোমার কিতাব পড়ো”।

অথচ আমরা সেই কিতাবটাই পড়ি না, বুঝি না, বরং দাসত্ব করি হাদিস, ফিকহ, তাফসিরের।

৭. হাদিসের অনুসরণ কোরান নির্দেশ করে না।

কোরানে শত শত আয়াতে বলা হয়েছে "আল্লাহ ও রসূলের আনুগত্য করো", কিন্তু কোথাও বলা হয়নি "হাদিস অনুসরণ করো"। বরং কোরানে রাসূলের ভূমিকা কী ছিল, তা স্পষ্টভাবে বলা আছে:

“রাসূলের কাজ তো শুধু সুস্পষ্ট প্রচার করা।”

  • সুরা নূর ৫৪
  • সুরা মা’ইদাহ ৯২
  • সুরা ইমরান ২০

রসূল যে কিতাব অনুসরণ করতেন, তা ছিল কোরান:

“বল, আমি তো কেবল এই কোরান অধ্যায়ন করতে আদিষ্ট হয়েছি।”
সুরা নামল ৯১–৯২

৮. কোরানই যথেষ্ট, অন্য কোনো দলিল প্রয়োজন নেই।

“আমি এই কিতাবে কোন কিছুই বাদ দেইনি।”
সুরা আন-আম ৩৮

“তারা কি কোরান যথেষ্ট মনে করে না?”
সুরা আনকাবুত ৫১

এই আয়াতগুলো আমাদের স্পষ্টভাবে মনে করিয়ে দেয়, কোরানই যথেষ্ট। হাদিস, তাফসির, ফিকহ এগুলো মূল নয়। বরং একে একে পরকালের বিচার হবে কেবল কোরানের ভিত্তিতে।

উপসংহার: এখনো কি মুখস্তই করবো? নাকি বুঝবো?

আজকের এই আলোচনা থেকে এটা একেবারে স্পষ্ট, আল্লাহর পক্ষ থেকে কোরান পাঠানো হয়েছে শুধু মুখস্ত করার জন্য নয়, বরং অনুধাবনের জন্য, অনুসরণের জন্য, জীবন পরিবর্তনের জন্য। যারা এখনো মুখস্ত সংস্কৃতির ভেতরে আটকে আছেন, তারা যেন সজাগ হন। কারণ আল্লাহ প্রশ্ন করবেন:

“তোমাদের কী হয়েছিল, যখন আমার বাক্যগুলি তোমাদের সামনে পাঠ করা হতো, তখন তোমরা পিঠ ফিরিয়ে নিতে?”
সুরা মু’মিনুন ৬৬

 মন্তব্য....

এই লিখাটি কোনো বিশেষ গোষ্ঠী, মাযহাব, ইমাম বা ধর্মীয় নেতার বিরুদ্ধে নয়। বরং এটি একটি আন্তরিক আহ্বান। চলুন আমরা নিজেরা কোরান পড়ি, বুঝি এবং কোরানকেই একমাত্র জীবনের পথপ্রদর্শক হিসেবে গ্রহণ করি। মুখস্ত করার নামে চোখ বন্ধ রেখে অন্যের ব্যাখ্যার উপর নির্ভর করাকে আল্লাহ কখনও উৎসাহিত করেননি। কিয়ামতের দিন প্রত্যেকে নিজের আমলের কিতাব নিজেই পড়বে — সেই দিন যেন আমরা স্রষ্টার প্রশ্নের সদুত্তর দিতে পারি। কোরান সকলের জন্য, এবং তা বোঝা যায় — যদি আমরা সত্যিই বুঝতে চাই।

প্রাসংগিক প্রশ্নোত্তর।

প্রশ্ন: কোরান পড়ে সবাই কি বুঝতে পারবে?
উত্তর: হ্যাঁ, কোরান বারবার বলেছে—“আমি একে সহজ করেছি” সুরা কামার ১৭। বুঝতে চাইলে, ধীরে ধীরে পড়লে, অর্থসহ পাঠ করলে আল্লাহ নিজেই বুঝিয়ে দেবেন।

প্রশ্ন: হাদিস সম্পূর্ণ বাদ দিতে হবে?
উত্তর: কোরান কখনো হাদিস অনুসরণ করতে বলেনি। তাই যাচাই কবিরোধী হলে তা বাতিল করতে হবে সুরা হ বোঝা যায় যে সেটি আয়াতভিত্তিক আদেশ নিয়ে কথা বলছে, হাদিস নয়।

প্রশ্ন: মুখস্ত করলে কি সওয়াব নেই?
উত্তর: কোরানে কোথাও মুখস্ত করার সওয়াবের কথা বলা হয়নি। বরং বলা হয়েছে—চিন্তা করো, বুঝো, গ্রহণ করো।

পাঠকের প্রতি আহ্বান:

  • আজ থেকেই কোরান পড়ে বুঝা শুরু করুন। বাংলা অনুবাদ নিয়ে, বাক্য ধরে ধরে, প্রতিদিন অন্তত ১০টি বাক্য করে পড়ুন এবং ভাবুন।
  • মুখস্ত সংস্কৃতি থেকে বেরিয়ে আসুন। মুখস্ত নয়, মর্মস্থ করুন।
  • আপনার সন্তানদের হাফেজ বানানোর চেয়ে “বুঝে কোরান পড়া মানুষ” বানানো অনেক জরুরি।
  • কোরানই আমাদের সত্য ও মুক্তির পথ — একে জীবনের কেন্দ্রবিন্দু করুন।

আপনার মতামত নিচে মন্তব্যে জানান।
আরও এমন লেখার জন্য আমাদের ব্লগটি নিয়মিত পড়ুন:
👉 QReflects ব্লগ: https://qreflects.blogspot.com