💅"কোরানের বাইরের অনুসরণ নয়—শুধু আল্লাহর কিতাবেই মুক্তির নিশ্চয়তা"

ভূমিকা

মুসলিম সমাজে সবচেয়ে বড় বিভ্রান্তি সৃষ্টি করেছে এমন এক প্রশ্ন: “কোরানে না থাকলেও আপনি কেন তা পালন করেন?” এই প্রশ্নের পেছনে আছে এক গভীর উপলব্ধি—আমরা কি সত্যিই আল্লাহর কিতাবকে আমাদের জীবন বিধান হিসেবে মানি, নাকি যুগে যুগে তৈরি হওয়া মানুষের বানানো রীতিনীতি ও কাহিনীকেই ইসলাম বলে ধরে নিয়েছি?




আসুন আজ আমরা গভীরভাবে অনুধাবনের চেষ্টা করি, সত্যিই কি কোরানের বাইরে গিয়ে কোন বিষয় পালন করা উচিত? যদি না হয়, তাহলে কেন আমাদের চারপাশের ইসলাম চর্চা কোরান নির্ভর নয়?

কোরানই একমাত্র হিদায়েত।

আল্লাহ অনেকবার বলেছেন—এই কিতাব হুদাল্লিন্নাস, অর্থাৎ মানবজাতির জন্য পথনির্দেশ ২:২।

আবার ৬:১১৪ তে তিনি বলেন,

“আমি কি আল্লাহ ছাড়া অন্য কোন বিচারক খুঁজবো, যখন তিনি নিজেই বিস্তারিতভাবে কিতাব নাযিল করেছেন?”

সরাসরি এই ঘোষণার পরও যদি কেউ ধারনা করে, কোরান যথেষ্ট নয়, তাহলে সেটা কি কোরানের বিরুদ্ধাচরণ নয়?

নবী কি কোরানের বাইরে কিছু অনুসরণ করতেন?

আমরা স্পষ্টভাবে কোরানে পাই—

“সে নিজের ইচ্ছায় তো কিছু বলে না। এটা হলো ওহী, যা তার প্রতি প্রেরিত হয়।” ৫৩:৩-৪

এখানে ওহী বলতে কোরানকেই বুঝানো হয়েছে। কোরানে এসেছে—

“এই কোরান আমাকে নির্দেশ দেয়, যেন আমি তোমাদেরকে এবং যার কাছে কোরান পৌঁছায় তাকে সতর্ক করি।” ৬:১৯

নবী যে শুধুই কোরানের অনুসারী ছিলেন, সে বিষয়ে কোরানে স্পষ্ট। অথচ বর্তমানে তাঁর নামে এমন সব কথাবার্তা চালু আছে যা কোরানের সাথে সাংঘর্ষিক।

শুধুই কোরান মানা, মানে কি নবীকে না মানা?

এটা এক ধরণের চাতুর্যপূর্ণ প্রশ্ন। নবীকে মানার অর্থই হলো তার আনা কোরান মানা।

“যারা রাসূলকে অনুসরণ করে, তারা তো আসলে আল্লাহকে মানে” ৪:৮০।

কিন্তু হাদিস নামক বইগুলোর মাধ্যমে এমন সব বক্তব্য প্রচার করা হয় যা অনেকাংশর কোরানের বিপরীত হয়ে যায়, অথচ সেগুলোকেই নবীর কথা বলে আমরা জানি। শুধুই কোরান মানা না মানার প্রশ্ন আসলে নবীকে অমান্য করা নয়, বরং তাকে প্রকৃতভাবে অনুসরণ করা।

শুধুই কোরান মানলে কি কাফের?

যে ব্যক্তি এই কথা বলে সে নিজের অজান্তেই আল্লাহর বিরুদ্ধে অবস্থান নেয়।

কারণ, কোরানকেই একমাত্র গ্রহণযোগ্য বিধান হিসাবে ঘোষণা করা হয়েছে। ৬:১১৪, ১৮:২৭।

আল্লাহ বলেন,

“এই কিতাবের সকল কথাই গ্রহনযোগ্য এবং অপরিবর্তনীয়”। ১৮:২৭

তাহলে শুধু কোরান মানা মানে কাফের হওয়া নয়, বরং প্রকৃত মুমিন হওয়া।

হাদিস: এক মহা ষড়যন্ত্র?

যদিও হাদিসের সব কিছু কোরানের বিপরীত নয়, তবে বেশিরভাগই এমন যে, তা কোরানের মূল শিক্ষা থেকে মানুষকে দূরে নিয়ে যায়। তাই অনেকের ধারনা নবী পরবর্তী সময়ে ইসলামকে বিভ্রান্ত করার জন্যই হাদিস সংকলন শুরু হয়।




যেমন হাদিসের ভিত্তিতে নামাজের রাকাত, রোজার নিয়ম, হজ্জের কার্যক্রম নির্ধারণ করা হয়—যা কোরানে স্পষ্ট নয়। সুতরাং এগুলো কিভাবে ‘দ্বীনের অংশ’ হতে পারে?

প্রকৃত মুশরিক কে?

আল্লাহর নাম নিয়ে, তাঁর দাসত্বের নামে মানুষ যদি নিজের মনগড়া পদ্ধতি অনুসরণ করে, তাহলে সেটা কি প্রকৃত ইবাদত?

আল্লাহ বলেন—

“তাদের মধ্যে অধিকাংশই আল্লাহর সাথে শরিক করে, অথচ তারা বিশ্বাসী।”  ১২:১০৬

বর্ততমানের তথাকথিত মুসলমান সমাজে যারা আলেম হিসাবে চিহ্নিত, তাদের বড় অংশ ধর্মকে পেশা বানিয়ে ফেলেছে। নিজেদের কর্তৃত্ব টিকিয়ে রাখতেই তারা কোরানের বাইরে তৈরি করা ‘রিচুয়াল’ মানুষের ওপর চাপিয়ে দিয়েছে।

প্রচলিত নামাজ ও রোজা—কার্যকর?

কোরান বলে—

“সালাত মানুষকে অনৈতিক ও মন্দ কাজ থেকে বিরত রাখে।” ২৯:৪৫

কিন্তু বর্তমান নামাজের চর্চায় তা কি দেখা যায়? সমাজে সবচেয়ে বেশি দুর্নীতি, ঘুষ, অন্যায় যারা করে তাদের অনেকেই সময়মত নামাজ পড়ে। এ থেকেই বুঝা যায়, নামাজ প্রকৃত সালাতের স্ট্রাকচার নয়।

রোজা সম্পর্কে বলা হয়েছে—

“সিয়াম তোমাদের জন্য কুতিবা করা হয়েছে যেন তোমরা মুত্তাকী হও।” ২:১৮৩

কিন্তু মাসব্যাপী রোজার পরও যদি মানুষের আচরণে পরিবর্তন না আসে, তাহলে প্রশ্ন এসেই যায় এটা কি আসলেই কোরানের সিয়াম?

দলভিত্তিক ইসলাম: নিষিদ্ধ বিভ্রান্তি

কোরান বলে,

“তোমরা বিভিন্ন দলে বিভক্ত হয়ো না।” ৩:১০৩

তবুও ইসলাম বহু দলে বিভক্ত। প্রতিটি দলের নিজস্ব এক নেতা বা ‘মুরুব্বি’ থাকে, যার কথা কোরানের চেয়েও বেশি মানা হয়।

অথচ আল্লাহ বলেন—

“তোমাদের মধ্যে যাদেরকে কিতাব দেওয়া হয়েছিল, তারা বিভক্ত হলো শুধুমাত্র হিংসার কারণে।” ৪৫:১৭

প্রকৃত দাসত্বের ধারাবাহিক পথ

এখন প্রশ্ন, কিভাবে আমরা প্রকৃত দাসত্বের দিকে ফিরে যেতে পারি? এর উত্তর কোরানেই আছে।

১. বিশ্বাস ও সিয়াম 

আল্লাহর প্রতি বিশ্বাস স্থাপনের পরই মানুষকে সিয়ামের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে যেন তারা মুত্তাকী হতে পারে। ২:১৮৩

২. সিয়ামের মাধ্যমে কুরআন শিক্ষা 

রোজার মাধ্যমে একজন মুমিন যেন কোরানের জ্ঞান, হিকমা, উপমা ও করণীয়-বর্জনীয় ভালোভাবে বুঝে নিতে পারে। ২:১৮৭

৩. জ্ঞান অর্জনের পর কর্ম/সালাত প্রতিষ্ঠা 

এই জ্ঞানকে প্রসারিত রেখে সকল কাজেই আল্লাহর নির্দেশ তথা যিকির বজায় রাখতে বলা হয়েছে। এটাই প্রকৃত সালাত। ২:১৯৫

৪. জীবনভর হজ্জ/তাওয়াফময় পথচলা 

একজন মুত্তাকী সারাজীবন আল্লাহর পথে পরিভ্রমণ করতে থাকবে, অর্থাৎ তার জীবন হবে এক চলমান দাসত্ব। ২:১৯৬, ১৯৮)

৫. ভুল হলে পুনরায় সিয়াম ও সংশোধন 

কোনো ভুল করলে মানুষ যেন পুনরায় সিয়ামের মাধ্যমে নিজের ভুল সংশোধন করে এবং পুনরায় আল্লাহর পথে ফিরে আসে। ২:২০০, ৪:৯২, ৫৮:০৪

উপসংহার

বর্তমানে আমাদের সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন আত্মসমালোচনা। আমরা যে ইসলাম শিখেছি, তা কি সত্যিই কোরানভিত্তিক? না কি তা মানুষনির্ভর এক সংস্কৃতি?




আসুন, আমরা কোরানকেই একমাত্র জীবনবিধান হিসেবে গ্রহণ করি। নবী, রাসূল, ইবাদত—সবই কোরানের আলোয় বুঝে গ্রহণ করি। অন্যথায় আমরা শুধু নামেই মুসলমান হয়ে থাকবো। আর প্রকৃতপক্ষে কাফের ও মুশরিকদের চেয়েও ভয়ংকর বিভ্রান্তির মধ্যে নিমজ্জিত হব।

রেফারেন্স:

  • সুরা বাকারা: ২:২, ২:১৮৩, ২:১৮৭, ২:১৯৫, ২:১৯৬, ২:২০০

  • সূরা আনআম: ৬:১১৪, ৬:১৯

  • সূরা নিসা: ৪:৮০, ৪:৯২

  • সূরা কাফ: ৫০:৪৫

  • সূরা হুজরাত: ৪৯:১৩

  • সূরা আন-নাহল: ১৬:৮৯

  • সূরা মুহাম্মদ: ৪৭:২৪

  • সূরা তাওবা: ৯:৩১

  • সূরা ইউসুফ: ১২:১০৬

  • সূরা গাশিয়া: ৮৮:২১–২২

  • সূরা বাকারা: ২:৪২, ২:১৭০

  • সূরা কাহফ: ১৮:২৭

  • সূরা জুমার: ৩৯:২৩


আপনার মতামত নিচে মন্তব্যে জানান।
আরও এমন লেখার জন্য আমাদের ব্লগটি নিয়মিত পড়ুন:
👉 QReflects ব্লগ: https://qreflects.blogspot.com