“হিজাব” শব্দে লুকানো বিভ্রান্তির পর্দা উন্মোচন

ভূমিকা

বর্তমান মুসলিম সমাজে 'হিজাব' শব্দটি এক বিশেষ পোশাকের নাম হয়ে গেছে—মাথা থেকে পা পর্যন্ত ঢাকা কালো বস্ত্র। কিন্তু কোরানে কি সত্যিই 'হিজাব' শব্দের এমন অর্থ আছে? আদৌ কি আল্লাহ নারীদের এমন কোনো পোশাক পরার নির্দেশ দিয়েছেন? নাকি, আমরা বহু শতকের ভুল অনুবাদ ও সংস্কারবাদী প্রভাবের শিকার হয়েছি?


এই প্রবন্ধে আমি 'হিজাব' শব্দটি কোথায় কোথায় ব্যবহৃত হয়েছে, তার প্রেক্ষাপট, আরবি শাব্দিক বিশ্লেষণ, এবং ঐতিহাসিক বিকৃতি নিয়ে খোলামেলা আলোচনা করছি। —এই শব্দটি কীভাবে ধর্মব্যবসায়ীদের ‘নারী-নিয়ন্ত্রণকারী টুল’ এ পরিণত হয়েছে।


১. কোরানে ‘হিজাব’ শব্দটি কোথায় কোথায় এসেছে?


'হিজাব' (حجاب) শব্দটি কোরানে মোট ৮টি বাক্যে ব্যবহৃত হয়েছে। কোনোটিতেই এর অর্থ 'নারীর পর্দা' বা 'বিশেষ পোশাক' বুঝানো হয়নি। বরং বিভিন্ন প্রসঙ্গে এই শব্দটি ‘আড়াল’, ‘বাধা’, ‘দূরত্ব’, বা ‘পর্দার পেছনে থাকা’ এইসব অর্থ বহন করে।


🔹জান্নাত ও জাহান্নামের মাঝে ‘হিজাব’


“আর জান্নাতবাসী ও জাহান্নামবাসীদের মাঝে থাকবে একটি হিজাব (আড়াল/প্রাচীর)...”

Surah Al-A’raf 46

এখানে কোনো নারী, পর্দা, বা পোশাক নেই—বরং একটা সীমান্ত/বাধা বোঝানো হয়েছে।


  • অদৃশ্য হিজাব


“আর তুমি কোরান পাঠ করলে, আমি তাদের হৃদয়ের ওপর পর্দা (হিজাব) টেনে দেই যাতে তারা বুঝতে না পারে।

”Surah Al-Isra 45

এখানে "হিজাব" মানে অদৃশ্য মানসিক পর্দা, কোনো জামাকাপড় নয়।


  •  মরিয়মের ‘হিজাব’


“…সে (মরিয়ম) তাদের থেকে আলাদা হয়ে একটি আড়াল (হিজাব) গ্রহণ করলো।”

Surah Maryam 17

এই বাক্যে মরিয়মের "হিজাব" মানে ছিল শারীরিক দূরত্ব বা আলাদা থাকার ব্যবস্থা—কোনো মুখোশ বা কাপড় নয়।


২.  আরবি ভাষায় ‘হিজাব’ শব্দের প্রকৃত অর্থ কী?


▶️ শব্দমূল বিশ্লেষণ: ح ج ب (হা-জীম-বা)


‘হিজাব’ (حِجَابٌ) শব্দটি এসেছে মূলধাতু “হা-জীম-বা (ح ج ب)” থেকে, যার মৌলিক অর্থ:


  • আড়াল দেওয়া
  • দূরে রাখা
  • বাধা সৃষ্টি করা
  • চোখ/দৃষ্টি থেকে গোপন রাখা


সুতরাং, "হিজাব" মানে কখনোই ‘কাপড়’, ‘বোরখা’, বা ‘হিজাবি ফ্যাশন’ নয়। বরং এটি একটি অদৃশ্য, মানসিক বা ভৌগোলিক দূরত্ব বোঝাতে ব্যবহৃত শব্দ।


৩. কেন ‘হিজাব’ মানে ‘পর্দা’ বলা হলো?


এখানেই মূল প্রতারণার শুরু। ইসলামের নামেই কোরানের প্রকৃত শব্দের মানে পাল্টে গেছে।


  • “পর্দার আড়াল থেকে”


“...আর যখন তোমরা ওদের (নবীর স্ত্রীদের) কাছে কিছু চাও, তখন পর্দার আড়াল থে৪কে চাও।”

Surah Al-Ahzab 53




এখানে বলা হচ্ছে ‘মিন ওয়ারায়ি হিজাব’—অর্থাৎ, হিজাবের পেছন থেকে। কিন্তু এই ‘হিজাব’ কোনো জামা নয়। বরং একটি বাস্তব পর্দা, পর্দার মতো কাঠামো। এটা বিশেষ কক্ষ, দেয়াল, বা দূরত্ব হতে পারে। অথচ অনুবাদকরা একে বানিয়ে ফেলেছে 'নারীদের পর্দা' মানে হিজাবি জামা!


যদিও এই বাক্য ছিল শুধু নবীর ঘরের প্রসঙ্গ, সমগ্র নারীদের জন্য নয়।


৪. ঘোড়ারও ‘হিজাব’!?


এক অদ্ভুত উদাহরণ দেখা যায় এই বাক্যে:


“...যতক্ষণ না সেগুলো (ঘোড়াগুলো) হিজাবের পেছনে অদৃশ্য হয়ে গেল।”

Surah Sad 32


এখানে ঘোড়াগুলো সূর্যাস্তের সময় দৃষ্টির আড়ালে চলে গেল। বলুন তো, ঘোড়ারাও কি কালো বোরখা পরে অদৃশ্য হয়েছিল? না, "হিজাব" এখানে স্পষ্টতই ‘দূরত্ব’ বা ‘অদৃশ্যতার’ প্রতীক।


৫. হিজাব শব্দের ভুল ব্যাখ্যা: ধর্মের নামে শোষণের কৌশল।


‘হিজাব’ শব্দের অর্থ ভুলভাবে প্রচলিত হয়েছিল একটি বিশেষ উদ্দেশ্যে:


🔻 ইসলাম নয়, পিতৃতন্ত্রের (patriarchy) প্রয়োজনে:


  • নারীদের চলাফেরা নিয়ন্ত্রণ
  • পোশাকের নামে অবদমন
  • সম্মান রক্ষার নামে সমাজ থেকে নারীদের বিচ্ছিন্ন করা


এটা কোরানের নির্দেশ নয়, বরং সমাজ-নির্মিত ‘ইজ্জত’ ধারণার ফসল।





🔻 হিজাব ≠ পর্দা ≠ বোরখা ≠ নেকাব


‘হিজাব’ শব্দ আজ একটি ইসলামিক ফ্যাশন ব্র্যান্ড হয়ে আছে। যার উদ্দেশ্য কোরানিক বাস্তবতা আড়াল করে মুনাফা অর্জন।


৬. নারীদের পোশাক সম্পর্কিত প্রকৃত কোরানিক নির্দেশনা কী?


কোরানে নারীদের পোশাক নিয়ে স্পষ্ট ২টি বাক্য রয়েছে:


✅ ২৪:৩১ – “জিলবাব” বা “খিমার” নয়, ‘জিউব’ ঢেকে রাখতে বলা হয়েছে।


“…তারা যেন তাদের বক্ষদেশে নিজেদের আবরণ (খিমার)-এর প্রান্ত টেনে দেয়…”


শব্দ ‘খিমার’ মানে মাথা ঢাকার চাদর নয়। আর ‘জিউব’ মানে বুক বা হৃদয়। তাই বলা হয়েছে, বুক যেন অনাবৃত না থাকে—শ্লীলতা বজায় রাখার নির্দেশ।


✅ ৩৩:৫৯ – “জিলবাব” পরতে বলা হয়েছে, বোরখা নয়


“…তাদের (নারীদের) যেন জিলবাব দ্বারা নিজেদেরকে চেনা যায়, এবং হয়রানি না করা হয়…”


জিলবাব মানে বড় চাদর বা আবরণ, যেন শরীর পরিচিত থাকে, যেন উত্ত্যক্ত না করা হয়। কিন্তু এখানে বলা হয়নি—নাক ঢাকো, চোখ ঢাকো, গলা বেঁধে ফেলো।


৭. অনুবাদকদের দ্বিচারিতা ও বিভ্রান্তিকর ব্যাখ্যা।


অনেক অনুবাদক, বিশেষ করে উপমহাদেশীয় সংস্কৃতিতে বেড়ে ওঠা ইসলামপন্থীরা, কোরানের শব্দার্থে ইচ্ছেমতো পর্দা টেনে দিয়েছেন। তাদের ব্যাখ্যায় “হিজাব” শব্দ মানে হয়ে গেছে:


  • পর্দা

  • বোরখা

  • গলা ঢেকে ফেলা

  • চোখ ঢেকে ফেলা

  • রঙহীন জামা

  • বাইরে না যাওয়া ইত্যাদি।


কিন্তু এসবের কোনো ভিত্তি নেই কোরানে। বরং এগুলো এসেছে ইহুদি ও খ্রিষ্টান ‘মোনাস্টিক’ (ধর্মযাজকীয়) ধ্যান-ধারণা থেকে।


৮. হিজাব এবং আল্লাহর সাথে কথোপকথনের প্রসঙ্গ – 


“...আল্লাহ মানুষকে ওহী করেন, তা হয় ওয়ারায়ি হিজাব (আড়ালের পেছন থেকে)...”

Surah Ash-Shura 51




এখানে আল্লাহ নিজেও হিজাব ব্যবহার করেন—অর্থাৎ, আড়ালের পেছন থেকে কথা বলেন। আল্লাহ কি বোরখা পরেন? নিশ্চয়ই না। তাহলে কেন নারীর বেলায় একে বস্ত্র করে তুলে ধরা হচ্ছে?


৯. আসল হিজাব তো হৃদয়ের ভিতরে।


কোরান নারী ও পুরুষ উভয়ের জন্য মনে-প্রাণে আত্মশুদ্ধি ও সচেতনতা গ্রহণ করার কথা বলেছে। নারীকে ‘চোখে ঢেকে রাখো’ বলা হয়নি, বরং পুরুষকে চোখ নামাতে (lower gaze) বলা হয়েছে ২৪:৩০।


সুতরাং, আসল ‘হিজাব’ হচ্ছে:


  • লজ্জাশীলতা

  • আত্মসংযম

  • ভদ্রতা

  • সচেতন হওয়া

  • প্রবৃত্তির নিয়ন্ত্রণ


এটাই কোরানের প্রকৃত 'পর্দা'—যা হৃদয়ের আড়াল, দৃষ্টি ও মনোবৃত্তির সংযম।


 মন্তব্য:


এই প্রবন্ধে আমি যা দেখলাম তা এক কথায় বলা যায়—‘হিজাব’ শব্দ অর্থ পরিবর্তিত হয়ে, কোরানের বার্তা হয়ে আছে। নারীর পোশাক নিয়ে যেসব কোরানিক বাক্য আছে, সেগুলোও খণ্ডিতভাবে উপস্থাপন করা হয়।


হিজাব মানে কখনোই "মাথা ঢাকো" বা "কালো জামা পরো" নয়। বরং, একটি আড়াল, সীমা, গোপনীয়তা, বা নির্দিষ্ট দূরত্বের কথা বলা হয়েছে।


প্রাসঙ্গিক প্রশ্ন ও উত্তর:


প্রশ্ন: কোরানে কি নারীদের বোরখা পরার নির্দেশ আছে?


উত্তর: না। কোরানে নারীদের শালীন পোশাক পরার কথা বলা হয়েছে, কিন্তু বোরখা বা মুখ ঢাকার কোনো নির্দেশ নেই।


প্রশ্ন: তাহলে ইসলামী হিজাব বলে যে ফ্যাশন আছে, সেটি কিসের ভিত্তিতে?


উত্তর: এটি মূলত সাংস্কৃতিক ও ধর্মতান্ত্রিক অনুবাদ ও হাদীস নির্ভরতা থেকে উদ্ভূত। কোর্নে এমন পোশাকের কথা বলা হয়নি।


প্রশ্ন: তাহলে একজন ঈমানদার নারী কিভাবে শালীনতা বজায় রাখবে?


উত্তর:

দৃষ্টি সংযত করে ২৪:৩১

বুক ঢেকে রাখবে ২৪:৩১

অশ্লীলতা এড়িয়ে চলবে

উগ্র সাজসজ্জা ও উত্তেজক আচরণ থেকে দূরে থাকবে ৩৩:৩৩


উপসংহার:

কোরান কি বলে, আমরা কি মানি?


আজ সময় এসেছে—আমরা আমাদের চেতনায়, ভাষায় ও অনুশীলনে কোরানের প্রকৃত বক্তব্য ফিরে আনি। হিজাব মানে ‘আড়াল’, ‘দূরত্ব’, ‘বাধা’। এটি কোনো পোশাক নয়। কোরান কখনোই নারীর ওপর ফ্যাশন-নির্ভর ‘ইসলামি পোশাক’ চাপিয়ে দেয়নি।





সুতরাং, যারা নারীদের হিজাব-বোরখায় আবদ্ধ করে রেখেছে, তারা কোরান নয়—বরং সমাজ, অনুবাদ আর পুরুষতান্ত্রিক মতবাদ মেনে চলেছে।