ভূমিকা

আধুনিক সমাজে ধনসম্পদের বাহ্যিক প্রদর্শন যেন মানুষের সম্মানের একমাত্র মানদণ্ড হয়ে দাঁড়িয়েছে। কিন্তু প্রশ্ন হলো—সেই ধনসম্পদ কি প্রকৃত সুখ ও প্রশান্তি দিতে পারে? উত্তর খুঁজলে দেখা যায়, না। কারণ প্রকৃত প্রশান্তি আসে এমন এক গুণ থেকে, যা কেবল আল্লাহর পছন্দের মানুষদেরকেই দেওয়া হয়—আর তা হলো "হিকমাহ"।



১: হিকমাহ: কোরান অনুযায়ী প্রজ্ঞার পরিচয়

🔹 হিকমাহ্ শব্দের অর্থ

আরবী "الحِكْمَة" (হিকমাহ) এর অর্থ—সঠিক সিদ্ধান্ত গ্রহণ, সুপরামর্শ, যুক্তি ও বিবেকপূর্ণ কথা বলা।

🔹 কোরানে হিকমাহ কীভাবে বর্ণিত

কোরানের বর্ননায়:

يُؤْتِي الْحِكْمَةَ مَن يَشَاءُ ۚ وَمَن يُؤْتَ الْحِكْمَةَ فَقَدْ أُوتِيَ خَيْرًا كَثِيرًا ۗ

“যে চায় আল্লাহ উপযুক্ত মনে করলে তাকে হিকমাহ্ দান করেন। আর যাকে হিকমাহ্ দেয়া হয়, সে তো বিপুল কল্যাণ প্রাপ্ত হয়।”
সূরা আল-বাকারা ২৬৯

আবার কেউ না চাইলেও স্রষ্টার দয়ায় অনেক সময় হিকমাহর অধিকারী হতে পারে। যার প্রমান কোরানেই মিলে। এ বিষয়ের তথ্য আছে এখানে 👎

https://www.facebook.com/share/v/1AdQZrSHpY/

🔹 হিকমাহ প্রাপ্তির প্রকৃত মানে

হিকমাহ্ মানে কেবল বইয়ের জ্ঞান নয়, বরং এমন এক প্রজ্ঞা ও অন্তর্দৃষ্টি যা একজন মানুষকে দুনিয়ার প্রতিটি পরিস্থিতিতে সঠিক সিদ্ধান্ত নিতে সাহায্য করে, সন্তুষ্টি ও কৃতজ্ঞতায় জীবন-যাপন করতে শিখায়।

২: ধনসম্পদ আছে, কিন্তু শান্তি নেই?



🔹 বাহ্যিক সাফল্য, অন্তরের শূন্যতা

অনেক মানুষ আছে প্রাসাদ বানিয়ে সুখী নয়, বিলাসবহুল গাড়ি কিনে তৃপ্ত নয়, কারণ তার হৃদয়ে আছে অস্থিরতা—এবং তা হিকমাহের অনুপস্থিতির ফল।

কোরানের বর্ননায়:

وَمَن يُعْرِضْ عَن ذِكْرِي فَإِنَّ لَهُ مَعِيشَةً ضَنكًا

“যে আমার নির্দেশ পালনে বিমূখ, তার জন্য সংকুচিত জীবন হবে।”
সূরা ত্বাহা ১২৪

🔹 প্রতীকী উদাহরণ

টেবিল ভর্তি খাবার—অথচ প্রতিটা খাবারে আপনি খুঁত খুঁজেন, তৃপ্ত হয়ে খেতে পারছেন না। আর হিকমাহধারী ব্যক্তি আলু ভর্তা আর ডাল দিয়েও তৃপ্তিতে পেট ভরে খেয়ে উঠে। হিকমাহ না থাকলে স্ত্রী বা স্বামী, সন্তান, বাসা, গাড়ি কিছুই সুখ দিতে পারে না।

🔹 সম্পদের মালিক, কিন্তু ঈর্ষান্বিত

আপনি প্রিমিও গাড়ি কিনেছেন, কিন্তু পাশে কেউ BMW কিনেছে—আপনার মন খারাপ! এটা হিকমাহহীন মানসিকতা।

৩: হিকমাহ ও তথাকথিত গোপন ওহী: একটি প্রশ্নবোধক অধ্যায়

🔹 হিকমাহ কি গোপন ওহী?

অনেক হাদিস ও তাফসীরে বলা হয়—হিকমাহ গোপন ওহী, যা কোরানে নেই। কিন্তু প্রশ্ন হলো: যদি হিকমাহ্ গোপন ওহী হয়, তাহলে সেটার প্রকাশ কিভাবে ঘটলো, কে প্রকাশ করলো?

🔹 নবীর কি ওহী গোপন রাখার অধিকার ছিল?

আল্লাহ বলেন:

يَا أَيُّهَا الرَّسُولُ بَلِّغْ مَا أُنزِلَ إِلَيْكَ مِن رَّبِّكَ 

“হে রাসূল, আপনার প্রতি আপনার রবের পক্ষ থেকে যা নাযিল করা হয়েছে, তা পৌঁছে দিন।”
সূরা মায়েদা ৬৭

🔹 গোপন ওহী শব্দটি কোরানে নেই

কোরান ওহী বলতে বোঝায় প্রকাশ্য কিতাবের আকারে নির্দেশনা। কোনো হাদিস বা ফাতওয়া ভিত্তিক “টপ সিক্রেট ওহী” আল্লাহর পবিত্র কালামের সংজ্ঞায় পড়ে না।

৪: হিকমাহ ও কৃতজ্ঞতা: একে অপরের পরিপূরক

🔹 সন্তুষ্ট মনই প্রকৃত প্রশান্তি দেয়

আল্লাহ বলেনঃ

لَئِن شَكَرْتُمْ لَأَزِيدَنَّكُمْ 

“তোমরা যদি কৃতজ্ঞ হও, তবে আমি আরও দিব।”
সূরা ইব্রাহিম ৭

🔹 হিকমাহ মানেই আল্লাহর প্রতি আস্থা রাখা

যার মধ্যে হিকমাহ্ আছে, সে জানে—সে যা কিছু পায়, তা তার জন্য যথেষ্ট। সে ভোগবিলাসি নয়, বরং পরিপূর্ণতা খুঁজে নেয় অন্তরে।

৫: নবীদের দৃষ্টিতে হিকমাহ

🔹 লোকমানকে হিকমা দান

আল্লাহ বলেনঃ

وَلَقَدْ آتَيْنَا لُقْمَانَ الْحِكْمَةَ أَنِ اشْكُرْ لِلَّهِ 

“আমি লোকমানকে হিকমাহ দান করেছিলাম—তাকে বলেছিলাম, ‘আল্লাহর প্রতি কৃতজ্ঞ হও।’”
সূরা লুকমান ১২

লোকমানের হিকমাহের মূল নির্যাস ছিল কৃতজ্ঞতা, সঠিক উপদেশ, বিনয়, অহংকার থেকে দূরে থাকা—সবই কোরানে স্পষ্টভাবে বর্ণিত।

৬: হাদিস ভিত্তিক অতিরঞ্জন বনাম কোরানের সরলতা

🔹 হিকমাহ একটি চরিত্রগত গুণ, কোনো অতিপ্রাকৃত উপহার নয়

যারা শুধুই গায়েবী ফজিলত, যা কোনো নির্দিষ্ট ব্যক্তি বা দরবেশের মাধ্যমে আসে—তারা আসলে কোরানের সরলতাকে উপেক্ষা করছেন।

🔹 নবী নিজেও কোরান ব্যাখ্যার বাইরে কিছু বলেননি

কোরানে: নবি বলেন---

إِنْ أَتَّبِعُ إِلَّا مَا يُوحَىٰ إِلَيَّ 

“আমি তো কেবল তাই অনুসরণ করি যা আমার প্রতি ওহী করা হয়।”
সূরা আহকাফ ৯

উপসংহার

এই দুনিয়ায় অনেকে ধনসম্পদ, খ্যাতি ও বাহ্যিক সফলতার চূড়ায় পৌঁছেও নিঃস্ব ও অশান্ত মনেহয়, কারণ অনুপস্থিত থাকে স্রষ্টার দেওয়া হিকমাহ বা প্রজ্ঞা। কোরানের ভাষায়, প্রজ্ঞা এমন এক নেয়ামত এটি যাকে দেওয়া হয়, সে প্রকৃত কল্যাণ অর্জন করে। সূরা বাক্বারাহ ২৬৯।

প্রকৃত আত্মিক প্রশান্তির পথ তখনই খোলা হয়, যখন একজন মানুষ হিকমাহ অর্জন করে। তাই চূড়ান্তভাবে বলা যায়—প্রজ্ঞাহীন সম্পদ ধ্বংসের হাতিয়ার, আরগোপন ওহী বলে কারো কথা বিশ্বাস না করে, কোরান থেকেই হিকমাহ চেয়ে নিন।

আল্লাহ বলেনঃ

فَفَهَّمْنَاهَا سُلَيْمَانَ ۚ وَكُلًّا آتَيْنَا حُكْمًا وَعِلْمًا 

“আমি সুলাইমানকে তা বুঝিয়ে দিয়েছিলাম। এবং তাদের উভয়কেই (দাউদ ও সুলাইমানকে) হিকমা ও জ্ঞান দান করেছিলাম।”
সূরা আম্বিয়া ৭৯

মন্তব্য

আপনার জীবনে যদি শান্তি না থাকে, প্রাচুর্যের মধ্যেও যদি অস্থিরতা থাকে, তাহলে কোরান খুলুন, নিজেকে প্রশ্ন করুন—আপনি কি হিকমাহ প্রাপ্ত? হিকমাহ চেয়ে আল্লাহর কাছে দোয়া করুন।

প্রাসঙ্গিক প্রশ্ন

প্রশ্ন: হিকমাহ কি কোনো বিশেষ ইলম বা গায়েবী বার্তা?

উত্তর: না, কোরান অনুসারে হিকমাহ মানে সঠিক উপলব্ধি, কৃতজ্ঞতা, বিচক্ষণতা ও আত্মিক প্রশান্তি। এটি কোনো গোপন ওহী নয়।